বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতির অবনতি

সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতি

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতি বহুলাংশে রফতানিনির্ভর। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা ব্রুনাইয়ের মতো আসিয়ানভুক্ত কোনো কোনো দেশের মোট জিডিপিতে রফতানির অবদান ৬০ শতাংশেরও বেশি, যার বড় একটি অংশের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতি বহুলাংশে রফতানিনির্ভর। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা ব্রুনাইয়ের মতো আসিয়ানভুক্ত কোনো কোনো দেশের মোট জিডিপিতে রফতানির অবদান ৬০ শতাংশেরও বেশি, যার বড় একটি অংশের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে এসব দেশের রফতানিনির্ভর অর্থনীতিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি। আবার স্থানীয় পর্যায়েও আগে থেকেই ক্রমে দুর্বল হয়ে আসছিল ভোক্তা চাহিদা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্বের উন্নয়নশীল অঞ্চলগুলোর মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিই এখন সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে বলে মনে করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক’ (এডিও) প্রতিবেদনের জুলাই ২০২৫ সংস্করণে এডিবির এ পর্যবেক্ষণ উঠে আসে।

সংস্থাটি বলছে, বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতির অবনতি ও অনিশ্চয়তার কারণে চলতি বছর এশিয়া-প্যাসিফিকে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেতে পারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিগুলো। এ অবস্থায় অঞ্চলটির মোট প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করে কমিয়ে এনেছে এডিবি। সংস্থাটির নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মোট প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াতে পারে ৪ দশমিক ২ শতাংশে। ২০২৬ সালে এ হার হতে পারে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। দুই বছরের জন্যই এ অঞ্চলের প্রক্ষেপিত প্রবৃদ্ধির হার কমানো হয়েছে প্রায় অর্ধ শতাংশীয় পয়েন্ট।

এডিবি এমন একসময় এ পূর্বাভাস প্রকাশ করেছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত শুল্কনীতিতে ছাড় পেতে এশিয়ার কয়েকটি দেশ এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে সই করেছে। আলোচনার টেবিলে রয়েছে বেশকিছু দেশ।

সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার হবে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এর আগে গত এপ্রিলে দেয়া পূর্বাভাসে তা ৪ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল। এছাড়া ২০২৬ সালের জন্যও প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ করেছে এডিবি। এপ্রিলের প্রতিবেদনে ২০২৬ পঞ্জিকাবর্ষে সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪ দশমিক ৭ শতাংশ।

প্রতিবেদন এডিবি সতর্ক করেছে, যুক্তরাষ্ট্র শুল্কহার আরো বাড়ালে ও বাণিজ্য উত্তেজনা তীব্রতর হলে শুধু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নয়; সার্বিকভাবে গোটা এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলেরই অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ঝুঁকিকে আরো বাড়িয়ে তুলছে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। একই সঙ্গে চীনের রিয়েল এস্টেট খাতের দুরবস্থাও এ অঞ্চলের গড় প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এ বিষয়ে এডিবির প্রধান অর্থনীতিবিদ আলবার্ট পার্ক বলেন, ‘চলতি বছর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলকে বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতির ক্রমাবনতিকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। পৃথিবীজুড়ে অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি বাড়ায় অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও দুর্বল হয়েছে।’

এশিয়া-প্যাসিফিকের প্রবৃদ্ধিতে শ্লথগতির সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে তিনি বলেন, ‘এ অঞ্চলের দেশগুলোকে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে নিজেদের মৌলিক অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। মুক্ত বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সংযুক্তিকে উৎসাহদান অব্যাহত রাখতে হবে।’

এশিয়া-প্যাসিফিকের বৃহত্তম অর্থনীতি চীন ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। আগামী বছর এ হার নেমে আসতে পারে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে। যদিও দেশটির সরকার চলতি বছর অর্থনীতিতে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

দেশটিতে প্রবৃদ্ধির সরকারি লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়ার কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে রফতানি ও প্রপাটি খাতের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে ভোগব্যয় বৃদ্ধি ও শিল্প খাতে নীতিগত প্রণোদনার মাধ্যমে চীন বাড়তি চাপ সামাল দিতে পারবে বলে মনে করছে এডিবি।

এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ভারতের ক্ষেত্রেও প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ সংশোধন করে কমিয়ে আনা হয়েছে। এডিবির হিসাবে দেশটিতে এ বছর প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াতে পারে সাড়ে ৬ শতাংশে। আগামী বছরে তা হতে পারে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ।

প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ভারত এখনো বিশ্বের অন্যতম দ্রুততম প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি। কিন্তু মার্কিন শুল্ক ও বাণিজ্যসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা দেশটির অর্থনীতিকে বড় আকারে প্রভাবিত করবে। প্রতিবেদনে ২০২৫ অর্থবছরে ভারতের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, যা এপ্রিলে প্রক্ষেপিত হারের চেয়ে কম। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, কৃষি খাতে শক্তিশালী উৎপাদনের ফলে দেশটিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেছে।

জ্বালানি তেলের উত্তোলন বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকায় ককেশাস ও মধ্য এশিয়া অঞ্চলে প্রবৃদ্ধির সম্ভাব্য হার ২০২৫ সালে সাড়ে ৫ এবং ২০২৬ সালে ৫ দশমিক ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

এশিয়া-প্যাসিফিকের উন্নয়নশীল দেশগুলোয় মূল্যস্ফীতি কমে আসার পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যহ্রাস ও কৃষিপণ্যের উচ্চ উৎপাদন এ মূল্যস্ফীতি হ্রাসে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে এডিবি। সংস্থাটির হালনাগাদ পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ অঞ্চলে চলতি বছর ২ এবং ২০২৬ সালে ২ দশমিক ১ শতাংশ হারে মূল্যস্ফীতি হতে পারে। এপ্রিলের পূর্বাভাসে তা যথাক্রমে ২ দশমিক ৩ ও ২ দশমিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল।

এপ্রিলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জন্য ৫ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল এডিবি। তবে সর্বশেষ সংস্করণে তা আরো কম হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেয়া হলেও এর সুনির্দিষ্ট হার বা তা কত শতাংশীয় পয়েন্ট কমতে পারে, সে বিষয়ে সরাসরি কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।

সার্বিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি নিয়ে সংস্থাটির পূর্বাভাস হলো দক্ষিণ এশিয়ায় এ বছর প্রবৃদ্ধির চিত্র দেশভেদে ভিন্ন হবে। শ্রীলংকার অর্থনীতিতে গত জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে ব্যাপক মাত্রায় পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা দেখানো হলেও পুরো বছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানো হয়েছে। এজন্য মার্কিন শুল্কনীতি সংশ্লিষ্ট অনিশ্চয়তা ও সরকারি পুঁজি ব্যয়ের বাস্তবায়নজনিত দুর্বলতাকে দায়ী করা হয়েছে।

আরও